×
হোম আন্তর্জাতিক জাতীয় খেলাধুলা জীবনযাপন চাকরির খবর তথ্যকোষ ই-ম্যাগাজিন
অনলাইন টুলস
টাইপিং টেস্ট CV মেকার ফটো রিসাইজার Age ক্যালকুলেটর AI কন্টেন্ট ডিটেক্টর প্লাজিয়ারিজম চেকার অন্যান্য টুলস লগইন

মহিলা বাস সার্ভিস (বাংলাদেশ)

বাংলাদেশে নারীদের জন্য বিশেষ বাসসেবা চালুর ইতিহাস বেশ পুরোনো। গণপরিবহনে নারীদের হয়রানি, নিরাপত্তাহীনতা ও পর্যাপ্ত আসন সংকটের কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রায় তিন দশক আগে নারীদের জন্য আলাদা বাসসেবা চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার।
সূচিপত্র

ইতিহাস 

বাংলাদেশে নারীদের জন্য বিশেষ বাসসেবা চালুর প্রথম উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। ১৯৯৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে দেশের প্রথম মহিলা বাস সার্ভিস চালু করে বিআরটিসি।

এরপর ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর মহিলা বাস সার্ভিস আনুষ্ঠানিকভাবে চালু ও সম্প্রসারণ করা হয়। মূলত কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদ এবং স্বস্তিদায়ক যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করাই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

সময়ের সঙ্গে ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় এই সেবা সম্প্রসারণ করা হয়। তবে বাসের সংখ্যা ও রুটের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন সময়ে বাস ও রুটের সংখ্যা কমেছে-বেড়েছে।

২০১৫ সালেও মহিলা বাস সার্ভিসে ১২টি বাস চলাচল করত। পরবর্তী সময়ে সেবার পরিধি আরও সংকুচিত হয়। এক পর্যায়ে মাত্র পাঁচটি বাস চারটি রুটে চলাচল করত। ফলে কর্মজীবী নারীদের অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হতো।

প্রথম বেসরকারি মহিলা বাস দোলনচাঁপা

মহিলা বাস সার্ভিস নিয়ে আলোচনায় ‘দোলনচাঁপা’ নামটি প্রায়ই সামনে আসে। ২০১৮ সালের ২ জুন মিরপুর-মতিঝিল রুটে ‘দোলনচাঁপা’ নামে দেশের প্রথম বেসরকারি মহিলা বাস সার্ভিস চালু হয়। একই উদ্যোগের আওতায় মিরপুর সার্কেল থেকে আজিমপুর রুটেও বাস চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

অর্থাৎ, দোলনচাঁপা ছিল বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি মহিলা বাস সার্ভিস, কিন্তু দেশের প্রথম মহিলা বাস সার্ভিস নয়।

২০১৮ সালের ২ জুন রাজধানীতে র‍্যাংগস গ্রুপ ও ভারতের ভলভো আইশার ভেহিক্যালস লিমিটেডের উদ্যোগে সার্ভিসটির যাত্রা শুরু হয়। উদ্বোধনের সময় দোলনচাঁপার প্রথম বাসটি মিরপুর-১২ থেকে মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, শাহবাগ, প্রেসক্লাব ও গুলিস্তান হয়ে মতিঝিল রুটে চলাচল করত। নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। বাসগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা, জিপিএস ট্র্যাকার, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও হেল্পলাইন রাখা হয়েছিল। যাত্রীদের আগ্রহ বাড়ায় পরবর্তীতে দোলনচাঁপার সংখ্যা চারটি করা হয় এবং দুটি রুটে বাস চলাচল শুরু করে—মিরপুর-১২ থেকে মতিঝিল এবং মিরপুর ইসিবি চত্বর থেকে আজিমপুর। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় চলার পর দোলনচাঁপা সেবা বন্ধ হয়ে যায়; ২০২২ সালের ২৩ অক্টোবর এটি বন্ধ হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়।

পিংক বাস

নারীদের জন্য বিশেষ বাসসেবার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হয় ২০২৬ সালে। সরকার নারীদের জন্য ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুর উদ্যোগ নেয়।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় সরকার জানায়, নারীদের জন্য সম্পূর্ণ নারী পরিচালিত ও নারীদের ব্যবস্থাপনায় এই বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো নারীদের জন্য আরও নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থা তৈরি করা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) নারীদের নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও হয়রানিমুক্ত গণপরিবহন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ বা ‘পিংক বাস’ চালু করে। এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ১৮ আগস্ট ২০২৬ রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপোতে; পরদিন ১৯ আগস্ট থেকে নির্ধারিত রুটে নিয়মিত যাত্রীসেবা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় মোট ১৪টি বাস ১৩টি রুটে এই সেবা চালু করা হয়—ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ১০টি বাস ১০টি রুটে, চট্টগ্রামে ২টি বাস এবং বগুড়ায় ২টি বাস চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাকার রুটগুলোর মধ্যে নতুন বাজার–মতিঝিল, তালতলা–মতিঝিল, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার–জিপিও, মিরপুর-১০–মতিঝিল, মিরপুর–মতিঝিল, মিরপুর-১২–মতিঝিল, নারায়ণগঞ্জ–মতিঝিল, মোহাম্মদপুর–মতিঝিল (কমলাপুর হয়ে), আবদুল্লাহপুর–মতিঝিল এবং গাজীপুর–এয়ারপোর্ট রয়েছে। বাসগুলো নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টরদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এবং নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষভাবে এই সেবা চালু করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় মোট ১৩৪টি স্টপেজে সেবা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। যাত্রীসেবা আধুনিক করতে এতে ই-টিকিটিং, কিছু বাসে সিসিটিভি এবং বিটিএস প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে পিংক বাসের সংখ্যা ও রুট আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে; এর অংশ হিসেবে ১০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে।

প্রায় তিন দশকের পথচলা

১৯৯৮ সালে বিআরটিসির পরীক্ষামূলক উদ্যোগ থেকে শুরু করে ২০০১ সালের আনুষ্ঠানিক বাসসেবা, ২০১৮ সালের বেসরকারি ‘দোলনচাঁপা’ এবং ২০২৬ সালের ‘পিংক বাস’—বাংলাদেশে নারীদের জন্য আলাদা বাসসেবার ধারণাটি বিভিন্ন সময়ে নতুন রূপ পেয়েছে।

তবে শুধু আলাদা বাস চালু করাই নয়, নারীদের নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত গণপরিবহন নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগগুলোর মূল উদ্দেশ্য। বাসের পর্যাপ্ততা, নির্ধারিত রুটে নিয়মিত চলাচল এবং সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে নারীদের দৈনন্দিন যাতায়াতে এই ধরনের বিশেষ বাসসেবা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।