হেপাটাইটিস বি এমন একটি বি-ভইরাস যা সারা বিশ্বব্যাপী মারাত্মক সংক্রামক রোগের জীবাণু হিসেবে পরিচিত। শিশুদের অনেক বেশি  এ রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ নবজাতক শিশু হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করে। যারা ভবিষ্যতে এই রোগের বাহক হয়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদি বাহক এবং এদের ২০ শতাংশ লিভার ক্যান্সার ও সিরোসিসের কারণে মারা যেতে যায়। বাস্তব ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস-বি এইডসের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি সংক্রামক এবং প্রতিবছর এইডসের কারণে পৃথিবীতে যত লোক মৃত্যুবরণ করে তার চেয়ে বেশি মৃত্যুবরণ করে থাকে হেপাটাইটিস-বি’ এর কারণে।

হেপাটাইটিস বি কি ?

বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস একটি ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিষয়েক সমস্যা । হেপাটাইটিস বি এক ধরনের বি-ভাইরাস যা মুলত প্রথমে লিভারকে আক্রমণ করে।এর সংক্রমণের ফলে পৃথিবীর অন্যতম ঘাতক ব্যাধি লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার হয়ে যায় । রক্ত ও রক্তজাত পদার্থ মূলত এই ভাইরাসের প্রধান বাহক। প্রাথমিক পর্যায়ে এই ভাইরাসে আক্রান্ত- রোগী সাধারণ ভাবে কোনো লক্ষণ বহন করে না, অথচ এদের মাধ্যমে অন্যরা সংক্রমিত হয়ে যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, রক্তরস, লালা, বীর্য ও বুকের দুধ এক দেহ থেকে অন্য দেহের মধ্যে ভাইরাস বিস্তারে সহায়তা করে। সাধারণত আক্রান্ত মায়ের শিশু সন্তান, আক্রান্ত পরিবারের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ , বহুবার রক্ত গ্রহণকারী রোগী, মাদকাসক্ত ব্যক্তি, মানসিক রোগগ্রস্ত ব্যক্তি, স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যথা হাসপাতালে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ-যেমন চিকিৎসক, সেবিকা, ল্যাবরেটরিতে কর্মরত ব্যক্তি, দন্তরোগের চিকিৎসকেরা এই ভাইরাসে আক্রান্ত- হতে পারে ।

হেপাটাইটিস বি ভাইরাস এর মূল ইতিহাস:

ইতিহাসে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে হিপোক্রেটিসের আমলে মহামারী হিসেবে এক জন্ডিসের কথা পাওয়া যায়।এছাড়া ড. সাউল ক্রুগম্যান ১৯৫০ সালে একদল মানসিক রোগীর উপর গভীর গবেষণা চালিয়ে প্রথম এ ভাইরাসটি শনাক্ত করেন । তার দেয়া বিশেষ তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে ড. ব্লুমবার্গ হেপাটাইটিস বি ভ্যাক্সিন তৈরি করে। বর্তমানে ড. ব্লুমবার্গ এর তৈরি কৃত ভ্যাক্সিন এর পরিবর্তে রিকমবিন্যান্ট ভ্যাক্সিন ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

হেপাটাইটিস বি তে আক্রান্ত- হওয়ার ঝুকি:

যারা রক্তক্ষরন ও অন্যান্য কারণে সৃষ্ট রক্তশূন্য এর চিকিৎসায় বারবার ব্লাড ট্রান্সফিউশন করেন ।

সমকামী পুরুষদের মধ্যে যৌন মিলনের ফলে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে থাকে।এছারা নারী-পুরুষের মধ্যে একাধিক নারী-পুরুষের সঙ্গে যৌন মিলন ঘটালে।

ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক দ্রব্য সেবন করলে।

একই নিডল ও সিরিঞ্জের মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তির মাদক দ্রব্য গ্রহণ করলে।

রোগীর দেহ থেকে রক্ত সংগ্রহ, স্যালাইন বা ইনজেকশনের মাধ্যমে ওষুধ প্রয়োগ করার সময় অথবা ল্যাবরেটরিতে রক্ত ও রোগীর দেহ থেকে সংগৃহীত তরল পদার্থ নিয়ে পরীক্ষা করার সময় অসাবধানতা হলে।

হেপাটাইটিস বি সংক্রমিত রক্ত কিংবা অন্য যে কোন তরল জাতীয় পদার্থ স্বাস্থ্য কর্মীদের রক্তের সংস্পর্শে এলে।

হেপাটাইটিস বি রোগের প্রাদুর্ভাব অধিক হলে- এ ধরনের এলাকায় ছয় মাসের অধিক সময় অবস্থান করলে।

নার্সিং হোমে দীর্ঘ সময়ের জন্য অবস্থান বা কর্মরত থাকা হলে।

এছাড়াও হেপাটাইটিস বি’তে আক্রান্ত- মায়ের গর্ভজাত সন্তানদের অনাক্রান্ত মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তানদের তুলনায় হেপাটাইটিস বি’তে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অধিক।

শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ:

হেপাটাইটিস বি’তে নবজাতক শিশু পিতামাতার মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার হেপাটাইটিস বি ভাইরাস জন্মের সময় বাহক হিসাবে মা থেকে শিশুর মধ্যে সংক্রমিত হয়। এই ধরনের সংক্রমনকে ভার্টিক্যাল ট্রান্সমিশন বলা হয়ে থাকে । এছাড়া শৈশবে ও কৈশোরে খেলাধুলার সময় নখের আঁচড়ের মাধ্যমে বাহক শিশু থেকে সুস্থ শিশুতে এ রোগ ছড়াতে পারে । একই ভাবে সুচের দ্বারা নাক কান ফুটো করার মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে । আবার অশোধিত সিরিঞ্জ ও সুচ দ্বারা ও চুল কাটার সময়ও সংক্রমন ঘটতে পারে খুব সহজে ।

উপসর্গ

এক-তৃতীয়াংশ মানুষ কিছুই বুঝতে পারেন না।
এক-তৃতীয়াংশ মানুষের ফ্লুর মতো মাথাব্যথা, গা শিরশির এবং জ্বর হয়।

এক-তৃতীয়াংশ মানুষের জন্ডিস, ক্ষুধামন্দা, ডায়রিয়া, বমি ও জ্বর দেখা দেয়।

হেপাটাইটিস বি’ এর দীর্ঘ মেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব:

হেপাটাইটিস বি’তে আক্রান্ত- রোগীদের অধিকাংশই কোনো প্রকার চিকিৎসা ছারাই আরোগ্য লাভ করে থাকে। পাঁচ বছর বয়সের আগে আক্রান্ত শিশুদের শতকরা প্রায় ৯০ জনই লিভারের ক্রনিক বা দীর্ঘ মেয়াদি প্রদাহে ভুগতে থাকে। বয়স্কদের মধ্যে এ সংখ্যা হচ্ছে পাচ থেকে দশ ভাগ এর মত। ক্রনিক প্রদাহে আক্রান্ত রোগীদের শতকরা একজন প্রতি বছর চিকিৎসা ছাড়াই সম্পূর্ণ জীবাণু বিমুক্ত হয় আর শতকরা প্রায় ৩০ জন লিভার সিরোসিসের মতো মারাত্মক জটিলতায় ভুগতে থাকে। ক্রনিক হেপাটাইটিস বি’তে আক্রান্ত রোগীদের শতকরা পাঁচ থেকে দশজন লিভার ক্যান্সার বা হেপাটোসেলুলার কারসিনোমায় আক্রান্ত হয়েজ

চিকিৎসা:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা  সব নবজাতককে হেপাটাইটিস বি’এর টিকা নেয়া অত্যন্ত জরুরি বলে ঘোষণা করেছে এবং এর মধ্যে ৮০ টির বেশি দেশ এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে টিকা দেওয়ার সম্প্রসারিত কর্মসুচি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ সরকারও সকল শিশুকে হেপাটাইটিস বি ভ্যাক্সিন দেওয়ার জন্য একে ইপিআই ভ্যাক্সিন কার্যক্রমের অর্ন্তভুক্ত করেছে । এই টিকা যে কোনো বয়সে, যে কোনো দিনই নেয়া যায়। শতকরা নব্বই ভাগ মানুষের শরীরে এই ভ্যাক্সিন প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভাবে গড়ে তুলে ।

এই নীরব ঘাতক এ সংক্রামক ব্যাধিটি প্রতি মিনিটে কেড়ে নেয় দুজন নারী-পুরুষের প্রাণ। প্রতি বছর প্রায় ১০-৩০ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত- হইতেছে । এ রোগ থেকে মুক্ত থাকতে সবার প্রতিষেধক মুলক ব্যবস্থা নেয়া  খুব জরুরী। সর্বোপরি এ মহামারী ভাইরাস থেকে বাচাঁর জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।